শনিবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ৩ আশ্বিন ১৪২৮

শনিবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে কারবালার চেতনা
সুন্নীবার্তা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ আগস্ট, ২০২১, ৪:৩২ পিএম আপডেট: ১০.০৮.২০২১ ৬:৪৪ পিএম  Count : 189

                                                         
                                                                                          
হলকুমে হানে তেগ ও কে বসে ছাতিতে,
আফতাব ছেয়ে নিল আঁধিয়ারা রাতিতে।
আসমান ভরে গেল গোধূলীতে দুপুরে,
লাল নীল খুন ঝরে কুফরের উপরে।
                                                                -কাজী নজরুল ইসলাম

দ্বীন ও ঈমানের হেফাজতে খোদাদ্রোহী শক্তির বিরুদ্ধে আওলাদে রাসূলের প্রত্যক্ষ দ্বন্দ ও এক অসম যুদ্ধের নাম কারবালার যুদ্ধ। খাঁটি মুমিনের সেই থেকে প্রতীকি পরিচয় নির্ধারন হয়ে যায় হুসাইনী মুসলমান হিসেবে। কারবালার যুদ্ধ ইয়াযীদিদের পৈশাচিকতা ও পাশবিকতার এক নির্মম দলীল। হক্ব ও বাতিলের এ যুদ্ধ শুধু রক্তক্ষয়ীই ছিল না, এ যুদ্ধ ছিল লোম- হর্ষক, ঐতিহাসিকভাবে মানবতার জন্য কলঙ্কজনক এক অধ্যায়। 

কারবালায় সপরিবারে হযরত ইমাম হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু)’র শাহাদাতের পূর্বাপর ঘটনাবলীর চেয়ে নির্মম ও হৃদয়বিদারক অপর কোন ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে আর নেই। ৬১ হিজরীর ১০ মুহররমের সেই নির্মম শাহাদাতের ঘটনা পরম্পরা বিগত সাড়ে তেরোশ বছর ধরে মুসলিম সমাজে এতো বেশী আলোচিত হয়ে আসছে যে, যার ফলশ্রুতিতে দুনিয়ার সৃষ্টিলগ্ন হতে ১০ মুহররমে সংগঠিত পূর্ববর্তী নবীগণ (আলাইহিমুস্ সালাম)’র অপরাপর মহাঘটনাবলীও এর কাছে ম্লান হয়ে পড়েছে। কারবালার হৃদয় বিদারক উক্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজও কম বিভক্ত হয়ে পড়েনি যা কারবালার চেতনাকেই ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে দেয়। 

যে পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়টি কারবালার ঘটনাকে পুঁজি করে নিজেদের ষড়যন্ত্রের নীল নকশা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ হিসেবে বরেণ্য সাহাবী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) গণকে গালিগালাজ করার বা তাদের বিষয়ে মন্দ কথা বলার সুযোগ লুফে নেয়, তারা ‘শিয়া’ হিসেবে পরিচিত।  মনে রাখা উচিৎ যার কার্যক্রম বা আকীদা যে ফিরকার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তিনি সেই ফিরকার অনুসারী হিসেবে গণ্য হবেন। কেউ যদি মুখে 'আহলে বায়তের প্রেমের দাবি' করেন এবং 'শিয়াদের প্রতিষ্ঠিত আকিদা' সমূহ বিশ্বাস করেন তাহলে তিনি অস্বীকার করা সত্ত্বেও শিয়া আকীদার অন্তর্ভুক্ত হবেন যদিও সুন্নী দাবীদার হন।

আবার একটি শ্রেণী আছে যারা সূফীবাদের খোলসে সর্বধর্মবাদ তত্ত্ব ছড়াচ্ছেন। এদের মতে আখিরাতে মুক্তির জন্য মুসলিম হওয়া শর্ত নয়।এরা শিয়াদের মতই সাহাবী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) গণকে গালিগালাজ করার বা তাঁদের বিষয়ে মন্দ কথা বলার সুযোগ লুফে নেয়। এদের অনেকেই পূত-পবিত্র আহলে বাইতের মুহাব্বতের দাবীদার।পূত-পবিত্র আহলে বাইতের মুহাব্বতের দাবীদার হয়েও ইনারা ভুলে যান যে, ইমামে আলী মাকাম‎‎ ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহু তাঁর পবিত্র শাহাদাৎ এর পরেও ঈসায়ী ধর্মযাজককে ইসলামে দাখিল করেছন।

যে সম্প্রদায়টি কারবালার পুরো ঘটনার দায়-দায়িত্ব ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহুর উপরে চাপায় তারা বর্তমানে ‘খারেজী’, ‘ওহাবী’, ‘সালাফী’, ‘আহলে হাদীস’, ‘লা-মাযহাবী’ ইত্যাদি হিসেবে পরিচিত। এরা কারবালার পুরো ঘটনার দায়-দায়িত্ব ইমাম হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু)’র উপরে চাপানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত এবং কখনো কখনো সুষ্পষ্টভাবে জালিম ইয়াযিদকে নির্দোষ খলিফা এবং ইমাম হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কে দোষী ও বিদ্রোহী বলতেও দ্বিধা বোধ করে না।  যা বড়ই আফসোসের বিষয় ও সুস্পষ্ট গোমরাহী।

ইসলামের মূলধারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সূফী অনুসারীরা উপরে উল্লেখিত উগ্র এবং উদ্দেশ্য প্রনোদিত অভিযোগ ও মন্তব্যসমূহকে কঠিন ভাবে প্রতিহত করে আসছে। সুন্নীরা কারবালার ঘটনার জন্য সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) গনকে নির্দোষ জানলেও ইয়াযিদকে বড় পাপিষ্ট ও অভিশপ্ত বলে মনে করে এবং ইমাম হুসাইন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) কে জান্নাতে যুবকদের সরদার এবং ইসলামী চেতনার প্রতীক মনে করে।

আল-কুরআনের আলোকে আহলে বাইত তথা রাসূল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারবর্গের অতি উচ্চ মর্যাদা
    

"(হে মাহবুব) আপনি বলুন, আমি সেটার (রিসালাতের প্রচার এবং উপদেশ দান ও সৎপথ প্রদর্শন) জন্য 
তোমাদের নিকট থেকে কোন পারিশ্রমিক চাই না, কিন্তু নিকটাত্বীয়তার (আহলে বাইত) ভালোবাসা।" (সূরা শূরাঃ ২৩)

হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের থেকে বর্নিত, ‘আত্বীয়গণ’ দ্বারা রাসূল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ‘পবিত্র বংশধর’ বুঝানো হয়েছে। 
(বুখারী শরীফ) 


সহীহ্ হাদিসের আলোকে
হযরত আলী আল-মুরত্বাদা রাদিআল্লাহু আনহু,
হযরত ফাতেমাতুয যাহরা রাদিআল্লাহু আনহা এবং
হযরত ইমাম হাসান-হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহুমা’র পদমর্যাদা


১।  হযরত হুযাইফা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্নিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, জনৈক ফেরেশতা অত্র রাতের পূর্বে কখনো পৃথিবীতে অবতরন করেনি। সে স্বীয় রবের নিকট আমাকে সালাম করতে এবং এই সুসংবাদ দিতে অনুমতি প্রার্থনা করল যে, ফাতেমা জান্নাতি রমণীদের সরদার এবং হাসান-হুসাইন সকল জান্নাতি যুবকদের সরদার। 
[* বুখারী , আস- সহীহ, কিতাবুল মানাকিব, 
* তিরমিযী’ আল- জামি আস-সহীহ, 
* নাসায়ী, আস-সুনান আল-কুবরা, 
* আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনাদ, 
* বায়হাকী, আল-ই’তিকাদ ]

২।  হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান-হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমার জন্য বিশেষভাবে আশ্রয় চাইতেন এবং বলতেন, তোমাদের সম্মানিত দাদা (হযরত ইব্রাহীমও ) তাঁর দুই সন্তান ইসমাইল ও ইসহাক আলাইহিমাস সালামের জন্য নিম্নোক্ত বাক্যগুলোর মাধ্যমে আশ্রয় চাইতেন, “আমি মহান আল্লাহ্র পরিপূর্ণ শব্দাবলী দ্বারা প্রত্যেক শয়তান, আপদ-বিপদ ও বদনযর থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”
[* বুখারী, আস-সহীহ, কিতাবুল আম্বিয়া, 
* ইবনে মাজাহ, আস্ সুনান, কিতাবুত তিব্, 
* আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ]

৩।  হযরত মিসওয়ার ইবনে মাখরামা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্নিত, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
     ফাতেমা আমার শরীরের অংশ।   যে তাঁকে কষ্ট দেয়, সে আমাকেও কষ্ট দেয়। 
[* মুসলিম , আস-সহীহ, 
* নাসায়ী, আস-সুনান আল-কুবরা, 
* বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা]

৪।  হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 
    যে ব্যক্তি হাসান- হুসাইনের সাথে বিদ্বেষ পোষন করল, সে আমার সাথেই বিদ্বেষ পোষন করল। 
[* ইবনে মাজাহ্ , আস- সুনান, বাবু ফাযাযিলু আসহাবির রাসুলল, 
* নাসায়ী , আস সুনান আল কুববা, 
* আহমদ ইবনে হাম্বল, আল মুসনাদ ]

৫।  হযরত যাইদ ইবনে আকরাম রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্নিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী, হযরত ফাতেমা, 
    হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)’র কে বললেন, আমি তার সাথে যুদ্ধ করব যার সাথে তোমরা যুদ্ধ করবে 
    এবং আমি তার সাথে সন্ধি স্থাপন করবো যার সাথে তোমরা সন্ধি করবে। 
[* তিরমিযী, আল-জামি আস-সহীহ, 
* ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, 
* হাকেম, আল-মুসতাদরাক ]
কারবালা ঘটনা সম্পর্কে কিছু ভবিষ্যৎবাণী

কতিপয় বদমাযহাবী এও বলে থাকে যে, পবিত্র আশুরার দিন কারবালার যুদ্ধে একটা কাকতালিয় ঘটনা মাত্র এর কোন গুরুত্ব নেই। 
এই রকম বদদ্বীনের চর্চাকারীর উপর আল্লাহ্ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর লানত।

* হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, আমরা (প্রায়শঃ) শুনতাম, হুসাইন কারবালাতেই শহীদ হবেন।
( আল বিদায়াহ্ ওয়ান নিহায়াহ্,খাছায়েছে কুবরা)

* হযরত ইয়াহহিয়া হাদ্বরামী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন-আমি সিফফীনের সফরে হযরত আলী(রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এর সাথে ছিলাম । তিনি যখন ‘নীনওয়া’ বরাবর পৌঁছলেন তখন ডাক দিয়ে বললেন, “হে আবু আব্দুল্লাহ! ফোরাতের এ উপকন্ঠে ধৈর্য্য ধারন করতে হবে। ” আরজ করলাম এ কথার রহস্য কী? উত্তরে তিনি জানালেন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, জিব্ররাঈল আলাইহিস সালাম আমাকে জানালেন যে, হুসাইন ফোরাত নদীর কিনারায় শহীদ হবে। তিনি (জিবরাঈল) আমাকে সেখানকার এক মুঠো মাটি দেখিয়েছেন। 
( আল বিদায়াহ্ ওয়ান নিহায়াহ্, তাহুবীবুত তাহযীব)
 
উল্লেখ্য ওহাবী, খারেজীদের ভাবগুরু ইবনে তাইমিয়ার শিষ্য আল্লামা ইবনে কাসীর আল বিদায়াহ্ ওয়ান নিহায়াহ্ গ্রন্থের প্রনেতা।

ইয়াযিদের বদ আমলের ফিরিস্তি

আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন- “নিঃসন্দেহে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয় তাদের প্রতি আল্লাহ তা’য়ালা উভয় জগতে লানৎ (অভিশাপ ) বর্ষণ করেন এবং তাদের জন্য অপমানকর শাস্তির ব্যবস্থা করেন।” (সূরা আহযাব: ৫৭)

হযরত সা’দ বিন আবু ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ননা করেন, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করছেন যে ব্যক্তি মদীনাবাসীদের কোন অনিষ্ট করতে চায়, আল্লাহ তা’য়ালা তাকে গলিত শিশার মত গলাবেন। অপর এক বর্ণনায় আছে, তাকে সেভাবে গলিত করবেন, যেভাবে লবণ পানিতে গলে যায়। (মুসলিম শরীফ ) 

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআন পাকে, মক্কা মুকাররামাকে “বালাদুল আমীন” তথা নিরাপদ নগর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। আর নাপাক ইয়াযিদ ও তার দোসরগণ নবীজির আহলে বাইত, মক্কা ও মদীনাবাসীদের এমন অপমান ও লাঞ্চনা দিয়েছে যার কল্পনা করতেই অন্তর কেঁপে ওঠে। 

* ইয়াযিদ মদ্যপানের প্রসার ঘটায়। ( ইবনে আসীর, ত্বাবরী )

* হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হানযালা বলেন, ইয়াযিদ মা-বোন ও কন্যাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে লাগল, প্রকাশ্যে শরাব পান করতে লাগল আর নামায ত্যাগ করলো। ইয়াযিদ হচ্ছে সে-ই ব্যক্তি যে, আপন ভাই- বোনের বিবাহ জায়েজ ঘোষণা করেছিল। (তারীখুল খোলাফা)

* ইয়াযিদের সৈন্যবাহিনী ৬৩ হিজরীর হারবার যুদ্ধে মদীনা মুনাওওয়ারাতে নজীরবিহীন হত্যা, ধ্বংস, সম্ভমহানি ঘটায়।

* ইয়াযিদের জালেম বাহিনী হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহুর মত মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবীর দাড়ি মোবারক একটি একটি করে উপড়ে ফেলে। 

* ইয়াযিদী সৈন্যরা মসজিদে নববীকে ঘোড়ার আস্তাবলে পরিনত করে যে কারণে ইয়াযিদের সৈন্যবাহিনীর ভয়ে 
    তিনদিন পর্যন্ত মসজিদে নববীতে জামাতে সালাত আদায় বন্ধ হয়ে থাকে। 

* ইয়াযিদের জালিম সৈন্যবাহিনী মদীনা মুনাওওয়ারাতে হত্যাযজ্ঞের তান্ডব শেষ করে মক্কা মুয়াজ্জমাতে একই দুষ্কর্মের পুনরাবৃত্তি ঘটায়। 

* ইয়াযিদী বাহিনী এক নাগাড়ে চৌষট্টি দিন পর্যন্ত মক্কা শরীফ অবরোধ করে পবিত্র কাবা শরীফ তাক করে মিনজানীক (সে যুগে ব্যবহৃত কামান বিশেষ) দিয়ে এতটা পাথর বর্ষণ করে যে, পবিত্র কা’বা শরীফের চত্বর পাথরে ভর্তি হয়ে যায়। এক পর্যায়ে কা’বা শরীফের গিলাফ ও দেওয়াল পুড়ে যায়। তাদের ঐ পাথর নিক্ষেপে মসজিদে হারামের স্তম্ভগুলো চূর্ণ হয়ে যায় এবং দেওয়াল গুলোতে ফাটল ধরে।  
 ( আল বিদায়াহ্ ওয়ান নিহায়াহ্ , ত্বাবরী, ইবনে আসীর ) 
চরম লজ্জাকর, মর্মন্তুদ ও হৃদয় বিদারক এ ঘটনাবলী হিজরী ৬৪ সনের রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম দিকে ঘটেছিল।

* ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহ’র পবিত্র শির মোবারক যখন ইয়াযিদের দরবারের আনা হয় এবং তার সামনে রাখা হয়, তখন সে খুশীই হয়েছিল। তার হাতে একটি ছড়ি ছিল, যা দিয়ে সে ইমামের শির মোবারক এদিক ওদিক ওলট-পালট করছিল। (নাউযুবিল্লাহ) 
(আল বিদায়াহ্ ওয়ান নিহায়াহ , ইবনে আসীর )

* বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, ইয়াযিদ অবশ্যই নরাধম ইবনে যিয়াদের উপর লানত, গালি-গালাজ ইত্যাদি করেছিল। কিন্তু একটা ছিল তার রাজনৈতিক চালমাত্র। সে ইমাম হত্যার প্রেক্ষিতে দুঃখ প্রকাশও করেছিল বটে, কিন্তু সেটা এ কারণে ছিল না যে, তার দৃষ্টিতে ইমাম হত্যা অবৈধ ও মস্তবড় অপরাধ, নচেৎ সে কর্তব্যজ্ঞানে ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর হত্যাকারীদের অপরাধের শাস্তি অবশ্যই দিত। বরঞ্চ সে ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর হত্যাকারী ইবনে যিয়াদকে ও অন্যান্য হত্যাকারীদেরকে সম্মান ও পুরষ্কার দান করেছে যার ফলে ইয়াযিদের মুনাফিক চরিত্র ষ্পষ্ট হয়ে উঠে। সুতরাং ইয়াযিদ ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা যে অভিশাপের পাত্র তাতে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। 

কতিপয় আপত্তির জবাবঃ

বর্তমান সময়ে লা-মাযহাবী, ওহাবী, খারেজীদের কিছু ধর্মগুরু তাদের খুতবা-লেকচারে কারবালার যুদ্ধকে নিছক রাজনৈতিক যুদ্ধ বলার এবং নরাধম ইয়াযিদের নাম উচ্চারন করে “রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তথা আল্লাহ তার (ইয়াযিদ) এর উপর রহমত বর্ষণ করুন” বলার দুঃসাহস দেখিয়েছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে এহেন ব্যক্তিদের অন্তর্চক্ষু অন্ধ করে দিয়েছেন তা তাদের এসব মন্তব্য হতে একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেছে। কারবালার যুদ্ধ যদি নিছক রাজনৈতিক যুদ্ধ হয়ে থাকে, তবে কেন হযরত ইমাম হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সেনাবাহিনীর পরিবর্তে আহলে বাইতের মহিলা- শিশুসহ ক্ষুদ্র এক কাফেলা নিয়ে কুফার উদ্দেশ্য রওনা হলেন?

নিঃসন্দেহে সহীহ হাদিসসমূহ হতে স্পষ্ট যে আহলে বাইতের উপর দরূদ- সালাম সালাতের মধ্যে পাঠ করা আবশ্যক, সে-ই আহলে বাইতের উপর বর্বোরোচিত হত্যাকান্ড , নির্যাতন এবং মক্কা-মদিনা শরীফে নজীরবিহীন তান্ডব চালানোর মূল হোতা ছিল পাষন্ড নরাধম ইয়াযিদ ইয়াযিদ। এতসব প্রমাণসমূহের পরও যেসব নব্য ইয়াযিদী তওবা না করে দ্বীন ইসলামে দাখিল না হবে তাদের জন্য হাশরের ময়দানে রাহমাতাল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফাআতের আশা দুরাশা বৈ আর কিছুই নয়।

অপরদিকে শিয়াবাদীরা বলে," এতো সাহাবাগণ হায়াতে থাকার পরও কারবালা ঘটনার সময় উনারা কোথায় ছিলেন?"এক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মত হচ্ছে,সাহাবায়ে কেরামের কেউ ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহুর পক্ষে কারবালার ময়দানে ছিলেন না এটা একটি মিথ্যাচার। 

কারবালায় সাহাবায়ে রাসূল হাবীব ইবনে মাযহার আল আসাদী রাদিআল্লাহু আনহুসহ আরো আসহাবে কেরাম রাদিআল্লাহু আনহুম শহীদ হন। তাঁরা কেউ কুফাবাসী শিয়াদাবীদার ছিলেন না।  এছাড়া ইমাম হোসাইন রাদিআল্লাহু আনহু যুদ্ধের উদ্দেশ্যেও বের হন নাই বরং ইমাম হোসাইন রাদিআল্লাহু আনহুর প্রতিনিধির নিকট বাইআত হওয়া কুফাবাসীর পাঠানো শতশত চিঠির প্রেক্ষিতে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন।

কুফাবাসীদের মাধ্যমে হযরত হুসাইন (রাদিআল্লাহু আনহু) এঁর ক্ষেত্রে হিজরী ৬১ সালে কারবলায় যা ঘটেছিলো, হুবহু একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছিলো হিজরী ১২২ সালে ইমাম জয়নুল আবেদীন (রাদিআল্লাহু আনহু) এঁর সাহেবজাদাদের একজন হযরত যায়েদ ইবনে আলী (রাদিআল্লাহু আনহু) এঁর সাথে।

ইমাম জয়নুল আবেদীন (রাদিআল্লাহু আনহু) এঁর অপর সাহেবজাদা ইমাম বাকির (রাদিআল্লাহু আনহু)ও তখন মওযুদ ছিলেন।মদীনায় বসবাসরত হযরত যায়েদ ইবনে আলী(রাদিআল্লাহু আনহু)’র পরিবারবর্গ, তাঁর বন্ধু মালিক ইবনে আনাস (ইমাম মালিক) এবং কুফায় বসবাসরত ইমাম আবু হানিফা তাঁকে কুফাতে আসতে নিষেধ করেন৷ পরিবার এবং বন্ধুদের প্রবল বাধার বিপরীতে হযরত যায়েদ ইবনে আলী (রাদিআল্লাহু আনহু)কুফায় যাবার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং কুফা অভিমুখে রওনা করেন ও শহীদ হন।

দূরবর্তী ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকা বা উপস্থিত থাকতে না পারা মানেই শুভাকাঙ্ক্ষী না হওয়া নয়।নিঃসন্দেহে সাহাবায়ে কেরাম ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহুর শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন।
কারবালার দায় কার?

কারবালার জন্য দায়ী তো মূলতঃ কুফাবাসী সেই শিয়া দাবীদাররা যারা আহলে বাইতের মুহাব্বতের দাবী করে তাঁদেরকে ডেকে এনে নির্মমভাবে শহীদ করে দিয়েছে।এসব শিয়া দাবীদাররা নিজের কৃত অপরাধবোধ চাপানোর চেষ্টা করে আসহাবে কেরামের উপরে। কারবালার সাথে শিয়াবাদের কোন চৈতন্যগত মিল নেই। শিয়া দাবীদারদের সাথে যদি কারো কোন সম্পর্ক থেকে থাকে, তবে তা ইয়াজিদের বাহিনীর সাথে সম্পর্ক । আর সে সম্পর্ক হলো, আহলে বাইতকে বারবার বারবার হত্যা হয়ে যাবার জন্য দলবদ্ধভাবে ছেড়ে দেয়ার সম্পর্ক।


মনে রাখা উচিৎ কারবালা কুফা থেকে খুব কাছে।  কয়েকদিন যাবৎ ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু ‎‎আনহু কারবালায় আটকে ছিলেন।দিনে কয়েকবার কুফায় ইয়াজিদের বাহিনী কুফায় আসা যাওয়া করেছে।  ইয়াজিদের বাহিনীর হয়ে কুফাবাসী অনেক শিয়াবাদী দাবীদার অংশগ্রহণ করছে। ঘরের সামনেও কুফাবাসী কুফাবাসী শিয়া দাবীদাররা কারবালায় ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু ‎‎আনহুর সাহায্যে কারবালায় এগিয়ে আসে নাই।

পবিত্র আশুরায় যা কিছু বর্জনীয়:


১.বিপদের সময় ধৈর্য ও সংযম কখন ত্যাগ করবেন না। 
   কেননা বিপদে ধৈর্য্য ধারণই মুমিনের বৈশিষ্ট্য ও পরিচয়। 
২. মসীবতের সময় হাহুতাশ তথা চিৎকার শোরগোল, হা-পিত্যেস ইত্যাদি কাফিরদের বৈশিষ্ট্য ও পরিচয়।
৩. বিপদের সময় মুখে চপেটাঘাত বা খামচি মারবেন না। 
৪. পোশাক খুলে বুক-পিঠ পিটিয়ে শোক প্রকাশ ও মাতম করবেন না
৫. চুল আলুথালু (অবিন্যস্ত) করবেন না।
৬. চুল ছিঁড়বেন না।
৭. মাথা অনাবৃত করবেন না।
৮. উরুতে হাত মারবেন না।
৯. পোশাক ছিন্ন করবেন না।
১০.আল্লাহর অপ্রিয় কোন বাক্য তথা সন্তুষ্টির পরিপন্থী কোন কথা মুখে আনবেন না।

১১. অনেকে পবিত্র আশুরা উপলক্ষ্যে তাজিয়া মিছিল করেন, তাজিয়া মিছিলে ছোরা-কাঁচি তরবারি দিয়ে নিজের,
এমনকি ছোট শিশুদের দেহ রক্তা্ক্ত করেন। এসব কাজ ইসলাম পরিপন্থী।  এসব করবেন না।

১২. কান্নার আনুষ্ঠানিকতা করবেন না। যেহেতু একাজগুলো ধৈর্য্য ও আনুগত্যের পরিপন্থী, 
      অথচ ইসলামে ধৈর্য-আনুগত্যেরই নির্দেশ রয়েছে।
উদ্দেশ্যমূলকভাবে কালো পোশাক ধারণ করবেন না, 
      কেননা এটা জাহান্নামী (বাতিল)দের ও ফেরআউনের লেবাস। 

পবিত্র আশুরায় যা কিছু করণীয়

মুহররমে শাহাদাৎ-ই-কারবাার স্মরণে ভাবগম্ভীর পরিবৈশে অনুষ্ঠানাদি উদযাপন, ঈসালে সাওয়াবের নিয়তে নযর নেয়ায, দান-দক্ষিণা ও 
শরবত দুধ ইত্যাদি পান করানো কাম্য।

একবার হযরত সা’দ বিন উবাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু এসে আরয করলেন, “ইয়া রাসুল্লাল্লাহ্ আমার শ্রদ্ধেয়া আম্মাজান ইন্তেকাল করেছেন,
 (আমি জানতে চাই) তার রূহে সওয়াব পৌঁছাতে কী ধরনের সদকা উত্তম হবে? (যা আমি মায়ের জন্য করতে চাই) তখন নবীজি ইরশাদ করেলেন, 
‘পানি ’। তখন তিনি (সা’দ) একটি কূপ খনন করালেন। আর বললেন, এটা সা’দের মায়ের জন্য।                 (আবু দাউদ শরীফ, কিতাবুয যাকাত)

হযরত শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেন, “হযরত (হাসান ও হুসাইন) ইমামদ্বয়ের রূহে সাওয়াব পৌঁছানোর জন্য নেয়াযস্বরূপ যে খাবার (রান্না) হয় এবং যার উপর ফাতেহা, কুলখানী ও দরূদ পড়া হয়, তা তাবাররুক (বরকতমন্ডিত বস্তু)-এ পরিণত হয়। সে খানা (তাবাররুক হিসাবে) গ্রহণ করা অতি উত্তম (আমল)।” (ফাতাওয়া আজিজি)

হযরত শাহ্ রফিউদ্দীন মুহাদ্দিস দেহলভী কুরআনে পাকের একজন সফল অনুবাদক। তিনি এক ফতওয়াতে বলেন, মীলাদ শরীফের জন্য এবং মানুষদের একস্থানে একত্রিত করার জন্য রবিউল আউয়াল মাসে দিন তারিখ নির্ধারণ করা, আশুরার দিন অথবা মুহররম মাসে কিংবা অন্য মাসে ইমাম হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু)’র আলোচনার জন্য মাহফিল আয়োজন করা, সালামী বা শরীয়ত সম্মত মর্সিয়া (শোক গাঁথা) শ্রবণ করা, শুহাদায়ে কারবালার অবস্থা স্মরণে অশ্রু বিসর্জন ও কান্না করা ইত্যাদি জায়েয ও বৈধ। (মজমুআয়ে ফতওয়া)

শাহাদাতের আলোচনা যখন বানোয়াট বর্ণনা, নিষিদ্ধ শব্দমালা ও শরীয়ত পরিপন্থী লক্ষ্য উদ্দেশ্য থেকে মুক্ত হয়, তখন তা প্রকৃতই ইবাদাত। যেহেতু “ইন্দা যিকরিস সা-লিহীনা তানযিলুর রাহমাতু” অর্থাৎ আউলিয়ায়ে কেরামের আলোচনায় (আল্লাহ্র) রহমত নাযিল হয়।”
(আআ-লিউল ইফাদাহ ফী তা‘যিয়াতিল হিন্দ ওয়াবায়ানিশ শাহাদাহ্)


আরও সংবাদ   বিষয়:   আহলে বাইত   কারবালা   ইমাম হুসাইন   শিয়া   লা-মাযহাবী   ওহাবী   খারেজী   ঈসায়ী  




এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

প্রকাশক ও সম্পাদক :---
"মা নীড়" ১৩২/৩ আহমদবাগ, সবুজবাগ, ঢাকা-১২১৪
ফোন : +৮৮-০২-৭২৭৫১০৭, মোবাইল : ০১৭৩৯-৩৬০৮৬৩, ই-মেইল : [email protected]