শনিবার ১৭ এপ্রিল ২০২১ ৪ বৈশাখ ১৪২৮

শনিবার ১৭ এপ্রিল ২০২১

‘মুহাম্মাদ’ ও ‘আহমদ’- নামের শুরুতে ব্যবহার মীলাদুন্নবী ﷺ এঁর বরকতময় জিকির
মাহমুদ হাছান
প্রকাশ: শনিবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১৭, ১০:২০ এএম আপডেট: ০২.১২.২০১৭ ১০:৪৯ এএম  Count : 615

ফিকহের ফয়সালা-মাসায়ালা সুন্নাহ্; বিদায়াত নয়ঃ ‘মুহাম্মাদ’ ও ‘আহমদ’- নামের শুরুতে ব্যবহার মীলাদুন্নবীর বরকতময় জিকির।

ফুক্বাহায়ে ক্বিরাম (রহঃ) যেহেতু কুরআন ও হাদীসকে সামনে রেখে গবেষণা করে কুরআন ও হাদীসের ভিতরেরই মাসায়েলকেই একত্রিত করেছেন। তো সব মাসআলাতো ঠিক হবেই। কারণ ফিক্বহ ভুল হওয়া মানেতো কুরআন ও হাদীসই ভুল হয়ে যাওয়া।
যেমন- ফিক্বহের কিতাবে ওজুর ফরজ চারটি লিখা হয়েছে। কিন্তু কুরআন ও হাদীসের কোথাও এভাবে শিরোনাম দিয়ে ওজুর ফরজ লেখা নেই।
আমরা বলি ফিক্বহের কিতাবে লিখা ওজুর ফরজ যে চারটি লিখা হয়েছে, তা ঠিক। কারণ তা কুরআনের আয়াত থেকে উদ্ভাবনকৃত। যদিও কুরআনে স্পষ্ট শব্দে শিরোনাম দিয়ে চারটি নির্দিষ্ট করে ওজুর ফরজ নামে লিখা নেই।
এখন কেউ অজুর ফরজ অস্বিকার করলে আমরা তাকে বলবো সে কুরআন অস্বিকার করে।
এভাবেই ফিক্বহের কিতাবে সংকলিত মাসায়েলগুলো কুরআনের আয়াত ও হাদীসে নববী এবং সাহাবাগণের আমলকে সামনে রেখে সংকলিত করা। তাই এসব ভুল হওয়ার কল্পনাও করা যায় না।
বাকি আমলের ভিন্নতা থাকতে পারে। কারণ হাদীস ও সাহাবাগণের আমালের মাঝে ভিন্নতা ছিল। অর্থাৎ সুন্নাহের ভিন্নতার কারণে ফিক্বহের কিতাবে ভিন্ন ভিন্ন সুন্নাহ উদ্ধৃত হয়েছে। এর মানে কিন্তু কোন ফিক্বহকেই কুরআন ও হাদীস বিরোধী বা ভুল বলার কোন সুযোগ নেই। কারণ এসব কিছুই কুরআন ও হাদীস এবং সাহাবাগণের আমলেরই সংকলিত রূপ।

সুতরাং পরিস্কার বুঝা গেল, মুজতাহিদ ইমামগণের বক্তব্যকে ভুল সাব্যস্ত করা মানে হল, কুরআন ও হাদীস এবং সাহাবাগণের আমলকে ভুল সাব্যস্ত করা। আল্লাহ হিফাযত করুন।

দেওবন্দীদের সর্বগুরু আশ্রাফ আলী থানবী বলেছেন, 
‘যে কাজে লাভের চেয়ে ক্ষতির দিক প্রবল সেক্ষেত্রে মূলনীতি হল কাজটি যদি শরীয়তে ‘কাম্য ও করণীয়’ পর্যায়ের না হয় তাহলে মূল কাজটি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে যদি ‘কাম্য ও করণীয়’ হয় তাহলে মূল কাজটি নিষিদ্ধ করা হয় না, ক্ষতির দিকগুলি বন্ধ করা হয়।’
[সূত্রঃ ইমদাদুল ফাতাওয়া ৪/৮৪।]

পাক-ভারত-বাংলা অঞ্চলের মুসলিমদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামের নাম থেকে বরকত হাসিলের দু’টি পন্থা প্রচলিত আছে। 
সন্তানের নাম 'মুহাম্মাদ' রাখা কিংবা অন্য নাম রাখা হলেও নামের শুরুতে ‘মুহাম্মাদ’ শিরোধার্য করা। 
আমাদের এ অঞ্চলে দ্বিতীয় পদ্ধতিই অধিক প্রচলিত। এই দ্বিতীয় পদ্ধতি উপমহাদেশের দেওবন্দী ওয়াহাবী বাতীল ফির্কার প্রাচীন ও বর্তমান আকাবীর ও আমীরদের মাঝেও প্রচলিত।
যেমন-
০১/ ‘তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন’ এর লেখক- মুফতী ‘মুহাম্মাদ’ শফী সাহেবের নামের ‘মুহাম্মাদ’ শব্দের ব্যবহার বরকত হাসিলের জন্যে।
০২/ বাংলাদেশ দেওবন্দী ওয়াহাবীদের রাজনৈতিক প্লাটফর্ম হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশের আমীরের নাম হচ্ছে "শাহ আহমদ শফী"- এখানে "আহমদ" শব্দের ব্যবহার হচ্ছে বরকত হাসিলের জন্যে যা তাদের মূল ওয়াহাবী মতাদর্শীদের দৃষ্টিতে বিদায়াত। 
কিন্তু ওয়াহাবী মতাদর্শে দীক্ষিত হওয়ার পরে এখনো তা তাদের মাঝে প্রচলিত রয়েছে, এক্ষেত্রে তারা তাদের আদর্শিক পিতা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব নজদী'র মতাদর্শ পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারছে না। 
ভবিষ্যতে এই দেওবন্দী ওয়াহাবীরা নামধারী আহলে হাদিস ওয়াহাবীদের মতাদর্শে পরিপূর্ণ ধর্মান্তরিত হলে বরকত হাসিলের এই পদ্ধতি ত্যাগ করলে করতেও পারে।
অবশ্য ইতিমধ্যে 'মওদুদীর জামা-তে ইসলাম ওয়াহাবী' ও 'দেওবন্দী ওয়াহাবী'-দের মাঝে নতুন করে আহলে হাদিস নামধারী ফির্কায় ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ইসলামের দুশমনদের এ নামের প্রতি দুশমনীঃ

মুসলিম সমাজে ক্রমবর্দ্ধমান ঈমানী দুর্বলতার কারণে যদিও প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহববতের হক আদায় হয় না, তবুও এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তারা নবী মুহাম্মাদ (صلى الله عليه و آله و سلم) -এঁর মুহাববত অন্তরে ধারণ করেন। 
এই মহববতেরই বহিঃপ্রকাশ যে, তারা বরকতের জন্য নবীয়ে পাক (صلى الله عليه و آله و سلم) এঁর পবিত্র নাম তাদের নামের সঙ্গে শিরোধার্য করেন। যদিও সামান্য তবুও তা রাসূলের সঙ্গে সম্পর্ক। এ সম্পর্কটুকুও একশ্রেণীর ইসলাম বিদ্বেষীর গাত্রদাহের কারণ হয়ে যায়। এই পাক নামের চর্চা ও প্রচলন তাদের মর্মপীড়া উৎপাদন করে। কিন্তু ইলাহী ঘোষণা যখন এই-
وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ
অর্থাৎঃ এবং আমি (হে মাহবুব!) আপনার জন্য আপনার আলোচনাকে সমুন্নত করেছি।
[সুরা আল ইনশিরাহ, ৯৪/৪।]
তখন তাদের সকল বিদ্বেষ যে শুধু তাদেরকেই দগ্ধ করে যাবে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

রবিউল আউয়াল মাস নবীয়ে পাক (صلى الله عليه و آله و سلم) এঁর শুভাগমন তথা অতীব তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক শুভ বিলাদাত বা মীলাদের মাস। ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন।

সারা বছর তো বটে, মাহে রবিউল আউয়ালে মীলাদুন্নবী পাকের বিশেষত্বের কারণে মীলাদুন্নবী (صلى الله عليه و آله و سلم) এঁর আলোচনা করে, কিংবা শ্রবণ করে বরকত হাসিল করুন, প্রিয় নবী পাকের আলোচনা থেকে বরকত মুসলমানেরাই কেবল করে থাকে। 
মীলাদুন্নবী (صلى الله عليه و آله و سلم) এঁর মাহফিলের আয়োজন করুন, নবী প্রেমে উজ্জীবিত হোন।
পেঁচকের কখনই তা সহ্য হবে না।
ঈদে মীলাদুন্নবী (صلى الله عليه و آله و سلم) মুবারক।
______________
ঈদে মীলাদুন্নবী - ঈদ বলা যাবে কি না।
[সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম।]
তো ইমাম মালিকের এমন ভালোবাসা আর মুহাব্বাত যদি প্রশ্নের উর্ধ্বে থাকতে পারে, তবে মীলাদুন্নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের মাধ্যমে ভালোবাসা আর সম্মান প্রদর্শন প্রশ্নবিদ্ধ হবে কেন?

বলুনতো এই ধরণের তা'যীম কি সাহাবাগণ থেকে কখনো প্রমাণিত?

১. মিরকাত ও আশআতুল লুমআত এর ভূমিকায় ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহু এর জীবনী প্রসংগে লিখা আছে, ইমাম মালিক কখনো মাদীনা শরীফের মাটিতে ঘোড়ায় আরোহণ করেননি। যখন হাদীস বর্ণনা করতেন, এর আগে গোসল করে নিতেন। ভালো কাপড় পরিধান করে নিতেন। সুগন্ধি লাগাতেন। ভীতি ও গাম্ভীর্য সহকারে বসতেন।

২. তাফসীরে রুহুল বয়ানে রয়েছে, সুলতান মাহমুদ এর প্রিয় গোলাম ছিলেন আয়ায। আয়াযের ছেলের নাম ছিলো মুহাম্মদ। সুলতান মাহমুদ তার নাম ধরে ডাকতেন। একদিন সুলতান মাহমুদ গোসল খানায় গিয়ে ডাক দিলেন "হে আয়াযের ছেলে, পানি নিয়ে এসো"। 
আয়ায শুনে আরজ করলেন, হুযুর কি অপরাধ হলো ছেলের যে নাম নিলেন না? 
সুলতান মাহমুদ বললেন, ও সময় আমি অযুহীন ছিলাম; আর অযুহীন অবস্থায় আমি পবিত্র 'মুহাম্মদ' নাম কখনো উচ্চারণ করি না।

ইমাম মালিক আর সুলতান মাহমুদ এঁর মুহাব্বত কি সাহাবায়ে কিরাম থেকে বেশি ছিলো? 
নবীজির প্রতি উনাদের এমন তা'যীমের কি কোন প্রমাণ রয়েছে? 
নেই, তবুও উনারা করেছেন। কারণ, কারো প্রতি তা'যীমের জন্য সবর্দা প্রমাণের দরকার হয়না।
ঠিক তেমনি, মীলাদ শরীফে আমরা নবীজির তা'যীমে কিয়াম করি আর এমন তা'যীম সাহাবাগণ থেকে প্রমাণিত হতেই হবে তা শর্ত নয়।

দেখুন,
দেওবন্দীদের সর্বগুরু আশ্রাফ আলী থানবী বলেছেন, 
‘যে কাজে লাভের চেয়ে ক্ষতির দিক প্রবল সেক্ষেত্রে মূলনীতি হল কাজটি যদি শরীয়তে ‘কাম্য ও করণীয়’ পর্যায়ের না হয় তাহলে মূল কাজটি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে যদি ‘কাম্য ও করণীয়’ হয় তাহলে মূল কাজটি নিষিদ্ধ করা হয় না, ক্ষতির দিকগুলি বন্ধ করা হয়।’
[সূত্রঃ ইমদাদুল ফাতাওয়া ৪/৮৪।]

ইবনু তাইমিয়ার একটি কথাতো এরুপ যে, তা কোন কোন ক্ষেত্রে শরীয়তসম্মত না হলেও সওয়াব পাওয়া যাবে; সেটি হলো, 
من كان له نية صالحة اثيب علي نيته وان كان الفعل الذي فعله ليس بمشروع- اذا لم يتعمد مخالفة الشرع-
অর্থাৎ নিয়ত ঠিক থাকলে আর শরীয়তের বিরোধিতা করার ইচ্ছা না থাকলে সে যে কাজ করছে, তা যদি শরীয়ত সম্মত নাও হয়, তবুও সে ছওয়াব পাবে। 
[সূত্রঃ ইবনে তাইমিয়া : ঈক্তিদা সীরাত আল মুস্তাকিম।]
এখন বলুন, ইবনু তাইমিয়ার এ কথা দ্বারা আমাদের সমাজে প্রচলিত কী কী শরীয়তবিরোধী কাজে উৎসাহ দেয়া হল?


আরও সংবাদ   বিষয়:  মীলাদুন্নবী   ঈদে মিলাদুন্নবী   জুলুছ   মাহমুদ হাছান   মাহফিল   মাজার  




এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

প্রকাশক ও সম্পাদক :---
"মা নীড়" ১৩২/৩ আহমদবাগ, সবুজবাগ, ঢাকা-১২১৪
ফোন : +৮৮-০২-৭২৭৫১০৭, মোবাইল : ০১৭৩৯-৩৬০৮৬৩, ই-মেইল : [email protected]